এই নিঃশব্দ নির্যাতন মূলত ঘটিয়া থাকে যখন পিতৃদেব দ্বিতীয়বার দাম্পত্যসূত্রে আবদ্ধ হইয়া তৃতীয় সংসারের স্থাপত্য রচনা করেন, মাতৃদেবীও অন্যত্র কোনো নব্য সংসারে প্রতিষ্ঠিত হন। ফলে সন্তান অকস্মাৎ নিঃস্ব, নিরাশ্রয় ও অনাথতুল্য হইয়া পড়ে—যাহা সাধারণ জনের দৃষ্টিতে অদৃশ্য থাকে।
রাত দেড়টা বাজিয়া গিয়াছে। জানালার গ্রিল বেয়ে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকিয়া সুচিত্রের বুকে জমা হইতেছে। ঘুম আসে না। ঘুম কখনোই আসে না। হৃৎপিণ্ডের অভ্যন্তরে যেন কোনো জীর্ণ পায়সা অবিরাম ছুরিকাঘাত করিতেছে। সেই ক্ষতের নাম কষ্ট—অথচ এই ক্ষতের গভীরতা মাপিবার মতো কোনো যন্ত্র মানবসভ্যতা এখনো আবিষ্কার করিতে পারে নাই।
সুচিত্র বিছানায় পাশ ফিরিয়া নিকিতার দিকে তাকায়। নিকিতা নিদ্রামগ্ন। তাহার শ্বাসপ্রশ্বাসের নিয়মিত লয় দেখিয়া সুচিত্রের ভিতর একটা অমানুষিক ঈর্ষা জাগে—যে মানুষটি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতে পারে, সে কি সত্যিই বাঁচে? না বাঁচার নামান্তর মাত্র?
“শোনো, নিকিতা,” সুচিত্র ফিসফিস করিয়া উঠে। কণ্ঠস্বর কর্কশ, যেন কাঁচের ওপর ইট ঘর্ষণ করিতেছে। “তোমাকে কিছু বলিবার আছে। নইলে আমার বুকের ভিতর এই আগুন আমাকে ভস্মীভূত করিয়া ফেলিবে।”
নিকিতার চোখ খুলে যায়। সে ক্লান্ত দৃষ্টিতে সুচিত্রের দিকে তাকায়। “আবার রাত জাগিয়া বিষণ্ণতার গান গাহিবে?”
“বিষণ্ণতা নয়,” সুচিত্র কঠিন কণ্ঠে বলে, “অস্তিত্বের এক অদ্ভুত চিৎকার। যখন পিতৃদেব দ্বিতীয়বার দাম্পত্যসূত্রে আবদ্ধ হইয়া তৃতীয় সংসারের স্থাপত্য রচনা করিলেন, আর মাতৃদেবীও অন্যত্র নব্য সংসারে প্রতিষ্ঠিতা হইলেন—তখন সন্তান কী হয় জানো? অকস্মাৎ নিঃস্ব, নিরাশ্রয়, অনাথতুল্য। কিন্তু সেই অনাথত্ব কেহ দেখে না। কারণ সমাজের চোখে তুমি বাবা-মা-সম্পন্নই। অথচ অন্তরাত্মা জানে—তুমি এক শ্মশানে দাঁড়াইয়া আছ, যেখানে কেহ মরেও নাই, কেহ বাঁচেও নাই।”
নিকিতা চুপ করিয়া শোনে। সুচিত্রের চোখে জল নাই। কান্না বহুকাল আগে শুকাইয়া গিয়াছে। এখন কেবল জ্বালা।
“আমার বয়স যখন সাত,” সুচিত্র বলে, “সুচিত্রার বয়স চার। আমাদের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তারপর বাবা জোয়ারি লম্পট, মা মহৎ কিন্তু সন্তানের বিষয়ে উদাসীন। আমাদের আগলে রেখেছিল মাই—সেই একা। কিন্তু মাইয়ের বুকের দুধে কি বাবার বিশ্বাসঘাতকতা ধোয়া যায়? চাচা, দাদা, সবাই ঠকাইয়াছে। ঠকাইবার জন্য আলাদা আলাদা কৌশল। কাহারও ছল, কাহারও প্রেম, কাহারও অর্থের লোভ।”
সে থামে। নিশ্বাস ভারী হয়।
“এই যে আমি আজ এই বিছানায় শুইয়া আছি—আমার ভিতরে একটা বালক চিৎকার করে। সাত বছরের সেই বালক, যে দেখিয়াছে তাহার পৃথিবী টুকরো টুকরো হইয়া যাইতেছে। আর সেই টুকরোগুলো কেহ জোড়া দেয় নাই। দিবেও না।”
নিকিতা ধীরে হাত বাড়াইয়া সুচিত্রের হাত চাপা ধরে। কিন্তু সুচিত্র টান দিয়া হাত সরায়।
“স্পর্শের প্রতিকার নাই,” সে কঠোর কণ্ঠে বলে, “আমার বুকের ভিতর যে ক্ষত, তাহা রক্তস্রাব করিতেছে। সেই রক্তের বেগ ত্বরান্বিত, আর তাহা রুদ্ধ করিতে উদ্যোগী হইলে ব্যথার তীব্রতা সহস্রগুণ বর্ধিত হয়। এই নিঃশব্দ নির্যাতনের নাম কালরাত্রি। আর এই কালরাত্রির শেষ হয় না। কারণ যে মানুষ তোমার হওয়ার কথা ছিল, তারা যখন তোমাকে ‘তোমার’ বলে দাবি না করে—তখন তুমি চিরকালের জন্য এক ভূতুড়ে শহরের পথিক হইয়া যাও।”
সুচিত্র আবার চাঁদের দিকে তাকায়। রাত এখনও ঘন, অন্ধকার আরও গভীর। এবং ‘কালরাত্রি’র এই অধ্যায় এখানেই থামে না—থামে সেই ভয়ে, যেখানে গল্প এখনো অপ্রকাশিত, ক্ষত এখনো সবুজ, আর কষ্ট এখনো কথার বাইরে।
নির্ঘুম কালরাত্রির অংশবিশেষ অপ্রকাশিত উপন্যাস
— তৌফিক সুলতান


0 coment rios: