ঐতিহাসিক গৌরব থেকে আধুনিক সম্ভাবনার যাত্রা
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, কাপাসিয়া শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক সজীব অধ্যায়। কার্পাস (তুলা) চাষের ঐতিহ্য থেকে এই জনপদের নামকরণ হওয়া কাপাসিয়া, যা প্রমাণ করে এই অঞ্চল কৃষি ও বস্ত্র শিল্পে কতটা সমৃদ্ধ ছিল। মসলিন বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে এর গৌরবময় অতীত আজও ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই ঐতিহ্যবাহী জনপদটি ধীরে ধীরে উন্নয়নের আলো থেকে দূরে সরে গেছে।
নেতৃত্বের জন্মভূমি, কিন্তু অবহেলিত উন্নয়ন
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি তাজউদ্দীন আহমদ, বীর প্রতীক আবদুল বাতেন খান, সংবিধান প্রণেতা ফকির শাহাবুদ্দীনসহ অসংখ্য গুণীজনের জন্মভূমি এই কাপাসিয়া। রাজনীতি, প্রশাসন, আইন – সকল ক্ষেত্রে কাপাসিয়ার সন্তানরা উজ্জ্বল ভূমিকা রাখলেও অবাক করার বিষয় হলো, এই উপজেলা আজও পৌরসভার মর্যাদা পায়নি। একই জেলার শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালিগঞ্জ যখন পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়েছে, কাপাসিয়া রয়ে গেছে পিছিয়ে।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা: প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ
কাপাসিয়ার পর্যটন সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
প্রাকৃতিক সম্পদ:
· শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের অপূর্ব সঙ্গম
· ধাঁধারচরের রহস্যময় সৌন্দর্য
· একাধিক বড় দিঘি ও জলাভূমি
· সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ পরিবেশ
ঐতিহাসিক সম্পদ:
· সুলতানপুর শাহী মসজিদ (ঐতিহাসিক স্থাপত্য)
· দলোহাদীর লোহার খনি (প্রাক-ঔপনিবেশিক শিল্প ঐতিহ্য)
· তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতিকেন্দ্র
· প্রাচীন কার্পাস চাষের ঐতিহ্য স্থান
সাংস্কৃতিক সম্পদ:
· স্থানীয় কারুশিল্প ও হস্তশিল্প
· লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
· ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি
মু. সালাহউদ্দিন আইউবী-এর রূপকল্প: একটি পরিকল্পিত পর্যটন নগরী
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মু. সালাহউদ্দিন আইউবী-এর অঙ্গীকার শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি কাপাসিয়ার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন রোডম্যাপ। তাঁর "আকর্ষণীয় পরিকল্পিত পর্যটন নগরী" গড়ে তোলার ধারণা কাপাসিয়ার সমস্ত সম্ভাবনাকে একটি সুসংহত কাঠামোতে গুছিয়ে তোলার পরিকল্পনা।
পুনর্জাগরণের রোডম্যাপ: ধাপে ধাপে উন্নয়ন
প্রথম ধাপ: অবকাঠামোগত উন্নয়ন
· যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন (সড়ক, নৌপথ)
· বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
· ডিজিটাল কানেক্টিভিটি নিশ্চিতকরণ
দ্বিতীয় ধাপ: পর্যটন সুবিধা সৃষ্টি
· নদীকেন্দ্রিক পর্যটন কমপ্লেক্স
· ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ ও প্রদর্শনী কেন্দ্র
· ইকো-ট্যুরিজম ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন সুবিধা
· আবাসন ও হোটেল ব্যবস্থার উন্নয়ন
তৃতীয় ধাপ: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
· স্থানীয় পণ্যের বিপণন ও বিপণন কেন্দ্র
· ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন
· প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন (পর্যটন, হসপিটালিটি)
চতুর্থ ধাপ: সামাজিক উন্নয়ন
· শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন
· যুব ও নারী উন্নয়ন কর্মসূচি
· সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ
বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
কাপাসিয়াকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে যে অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো আসবে:
· প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান: হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রান্সপোর্ট, গাইডিং
· পরোক্ষ কর্মসংস্থান: হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য বিপণন, স্থানীয় পণ্য উৎপাদন
· যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি: পর্যটন সম্পর্কিত নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ
· স্থানীয় রাজস্ব বৃদ্ধি: যা পুনরায় স্থানীয় উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে
চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
চ্যালেঞ্জ:
১. অবৈধ দখল দূরীকরণ
২. পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা
৩. স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ
৪. পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আকর্ষণ
সমাধান:
১. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল
২. স্থানীয় জনগণের মালিকানাভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থা
৩. পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা
৪. জাতীয় পর্যটন নীতির সঙ্গে সমন্বয়
সুপারিশমালা
১. অবিলম্বে পৌরসভার মর্যাদা প্রদান: কাপাসিয়ার উন্নয়নের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পৌরসভার মর্যাদা দেয়া জরুরি।
২. সমন্বিত মাস্টারপ্লান প্রণয়ন: পর্যটন, আবাসন, পরিবহন ও পরিবেশের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক পরিকল্পনা।
৩. তাজউদ্দীন আহমদ ট্রায়াঙ্গেল গড়ে তোলা: কাপাসিয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা-গাজীপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটি বিশেষ পর্যটন অঞ্চল ঘোষণা।
৪. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা: কাপাসিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়ে একাডেমিক গবেষণা প্রকল্প।
৫. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: ইউএনডিপি, বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেয়া।
আশার নতুন আলো
মু. সালাহউদ্দিন আইউবী-এর এই অঙ্গীকার কাপাসিয়াবাসীর মনে যে আশার আলো জ্বেলেছে, তা শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং ব্যাপক সামাজিক ঐকমত্য।
কাপাসিয়ার পুনর্জাগরণ শুধু একটি উপজেলার উন্নয়ন নয়, এটি হবে বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য আধুনিকতার সঙ্গে সমন্বয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কাপাসিয়া যদি সত্যিই একটি পরিকল্পিত পর্যটন নগরীতে রূপান্তরিত হয়, তবে তা হবে গোটা দেশের জন্য একটি মডেল উন্নয়ন প্রকল্প।
ইতিহাসের পাতায় কার্পাসের সোনালি আঁশের মতোই কাপাসিয়ার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হোক – এই প্রত্যাশা সকল কাপাসিয়াবাসীসই দেশবাসীর। মু. সালাহউদ্দিন আইউবী-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে কাপাসিয়াকে পর্যটন মানচিত্রে নতুন স্থান দিতে।


0 coment rios: